বিশ্ববাজারে গত বছর চালের দাম কমলেও দেশে বেড়েছিল উল্লেখযোগ্য হারে। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছিল দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। এর পরও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়িয়েছে সিন্ডিকেট। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, সিন্ডিকেট নয়, গত বছর চালের দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে টানা ১০ দিনের ছুটি। দেশের ইতিহাসে ঈদকে কেন্দ্র করে এত বড় সরকারি ছুটির তথ্য আর পাওয়া যায় না। মাসের এক-তৃতীয়াংশ ছুটি সেই সময় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির পাশাপাশি চালের দামেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল।
গত বছরের ১৫ জুন থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত দেশের ১৮ জেলার ৬১টি উপজেলায় কৃষিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে জরিপ চালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউনিট ও গভর্নরের দপ্তর। ‘আ স্টাডি অন ভ্যালু চেইন ইফিশিয়েন্সি অব দি এগ্রিকালচারাল প্রডাক্টস ইন বাংলাদেশ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শিরোনামে যৌথভাবে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেশের বাজারের মোটা ও সরু চাল নিয়ে জরিপ করে। ওই জরিপে ২৭ জন কৃষক, আটজন মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়া, ১১ জন আড়তদার, ১২ জন রাইস মিলার ও ১৪ জন পাইকারি ক্রেতার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।
জরিপ পরিচালনাকালে দেশের বাজারে মোটা চালের খুচরা বিক্রয়মূল্য ছিল ৬১ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে দাম ছিল ৫৫ টাকা। একই সময়ে সরু চালের দাম ছিল ৭৮ টাকা; যা এক বছর আগে বিক্রি হয়েছিল ৭০ টাকা কেজি দরে। এক বছরের ব্যবধানে দেশের বাজারে মোটা ও সরু চালের দাম বাড়ে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯ ও ১১ শতাংশ। দর বৃদ্ধির পেছনে ঈদুল আজহার লম্বা ছুটি অন্যতম প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদুল আজহার সময় অধিকাংশ চালকল টানা ১০ দিন বন্ধ ছিল। একই সঙ্গে ব্যাংক বন্ধ থাকায় ধান কেনাবেচা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ধান বিক্রি না করে মজুদ করেন। ঈদের পর মিলগুলো একসঙ্গে উৎপাদনে ফিরলে ধানের চাহিদা বেড়ে যায়, কিন্তু বাজারে সরবরাহ সীমিত থাকায় ধানের দাম বাড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চালের দামে।
তবে শুধু ঈদের ছুটি নয়, কৃষকের উৎপাদন খরচ, মজুরি ও সেচ খরচ বৃদ্ধি, চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাওয়া, অন্য পণ্য উৎপাদনে ঝুঁকে পড়া, আমদানির ওপর শুল্কারোপও চালের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে উঠে এসেছে গবেষণাপত্রে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়ে ওই গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউনিট) মো. সেলিম আল মামুন। তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে মিলারদের ধান মজুদের অনুমতি দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে তাদের প্রতি ১৫-৩০ দিন অন্তর নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল বাজারে ছাড়তে বাধ্য করতে হবে। এ প্রক্রিয়া খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত।’
ধান-চালের বাইরে আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের বাজার নিয়েও জরিপ পরিচালনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দেখা যায়, গত বছর আলুর উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে সংরক্ষণ সুবিধা সীমিত হওয়ায় কৃষকরা কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। দেশের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী জেলা রংপুর ও বগুড়া। গত বছরের ৪ জুলাই এ দুই জেলার ২২ উৎপাদনকারী, ১৪ ফড়িয়া, পাঁচ আড়তদার ও আট হিমাগার প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছিলেন জরিপকারীরা। জরিপে দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে আলুর উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি গড়ে ১৯ টাকা ছিল; যা আগের মৌসুমে ছিল ১৪ টাকা। এ সময় খেত থেকে সরাসরি আলু বিক্রি করলে কৃষকরা কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ১৩ টাকা ও বাড়ি থেকে বিক্রি করলে ১২ টাকা পাচ্ছিলেন। বিপরীতে আগের মৌসুমে খেতের আলু কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকা ও বাড়ির আলু কেজিপ্রতি ২৫-৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। লোকসান সামাল দিতে কৃষকরা হিমাগারে আলু রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সীমিত হিমাগার ও ভাড়া বৃদ্ধির কারণে উৎপাদিত আলুর ৫৯ শতাংশ সংরক্ষণ করা গেছে মাত্র। ওই বছর হিমাগারে কেজিপ্রতি আলু সংরক্ষণ চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ দশমিক ৭৫ টাকা।
দেশের চারটি প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদন জেলা—পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও রাজশাহী। দেশের ৫৫ শতাংশ পেঁয়াজই উৎপাদন হয় এ চার জেলায়। জরিপ পরিচালনাকালে ঢাকার খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম ছিল গড়ে ৪৩ টাকা। ওই সময়ে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ উৎপাদনের গড় খরচ ছিল ৩৩ টাকা। তবে কাগজে-কলমে কৃষকদের প্রায় ৩০ শতাংশ মুনাফা দেখালেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
গত বছরের মার্চের মাঝামাঝিতে আগাম কাটার সময় পেঁয়াজের দাম নেমে গিয়েছিল কেজিপ্রতি ২২-২৮ টাকায়। এতে অনেক কৃষক সরাসরি লোকসানের মুখে পড়েন। এর সঙ্গে আছে সংরক্ষণজনিত ক্ষতি। জরিপে উল্লেখ করা হয়, এক মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করলে সাত মাস পর তা প্রায় ২৭ কেজিতে নেমে আসে। মূলত পেঁয়াজ শুকিয়ে ওজন কমে যাওয়া ও পচে যাওয়ার কারণেই ওজন কমে গিয়ে লোকসান হয়। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, সব ঝুঁকি ও ক্ষতি সামাল দিয়ে যুক্তিসংগত লাভ পেতে কেজিপ্রতি অন্তত ৫০-৬০ টাকা দর প্রয়োজন।
দেশের আরো দুই নিত্যপণ্য ব্রয়লার মুরগি ও ডিম। গাজীপুর, নরসিংদী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলা ব্রয়লার মুরগি ও ডিম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। জেলাগুলোতে জরিপকালে খামার পর্যায়ে ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে কেজিপ্রতি গড় খরচ ১৩২ টাকা হলেও বিক্রয়মূল্য পেয়েছিলেন ১২০ টাকা মাত্র। যদিও এর আগের মৌসুমে উল্টো চিত্র ছিল এ খাতে। তখন গড়ে ১৪৩ টাকা বিক্রয়মূল্যে খামারিরা কেজিপ্রতি প্রায় ১১ টাকা লাভ করেছিলেন। খামারিরা বলছেন, ব্রয়লার উৎপাদনের ৭৫ শতাংশ খরচই খাদ্যের পেছনে যায়। ফলে ব্রয়লার খাদ্যের দামে সামান্য ওঠানামা হলেও তা উৎপাদন ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলে। এছাড়া সবশেষ ঈদুল আজহায় বাজারে লাল মাংসের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ব্রয়লার মাংসের চাহিদা হঠাৎ কমে যায়। এ চাহিদা হ্রাসের বিপরীতে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় খামার পর্যায়ে দাম দ্রুত পড়ে যায়। এর পুরো লোকসানের চাপ পড়ে উৎপাদকদের ওপর।
একই চিত্র ডিমের ক্ষেত্রেও। জরিপে উৎপাদকরা বলেন, প্রতি পিস ডিমে তাদের উৎপাদন খরচ ৮ টাকা ৯৩ পয়সা হলেও বিক্রয়মূল্য ছিল ৮ টাকা ১২ পয়সা। তবে যেসব খামারের নিজস্ব ফিড মিল রয়েছে, তারা তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করতে পারেন।
গবেষণায় বলা হয়, পোলট্রি খাদ্যের ফিডের দাম নিয়ন্ত্রণের ওপর সরকারের নজরদারি জোরদার করা উচিত। এছাড়া পোলট্রি কাঁচামাল ও ওষুধ আমদানিতে অতিরিক্ত কর কমানো এবং শুল্ক প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার দেয়া দরকার। করপোরেট বাদে পোলট্রি খাতকে কৃষি খাত হিসেবে ঘোষণা করে বিদ্যুৎ, কর ও ঋণের বিশেষ সুবিধাও দেয়া যেতে পারে। এছাড়া ছোট খামারিদের সুরক্ষায় সরকারের চালু করা পোলট্রি খাতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) নীতি কার্যকর হলে বাজারের অস্থিরতা থেকে ছোট খামারিদের সুরক্ষা, ন্যায্য আয় নিশ্চিতকরণ, লোকসানের কারণে খামার বন্ধ হওয়া রোধ এবং খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে বলে গবেষণার তথ্যে উঠে এসেছে।